একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে প্রতিটি মা নিজেকে দেখা, শোনা এবং সত্যিকার অর্থে সমর্থিত অনুভব করেন।

একজন মায়ের গল্প থেকেই শুরু হয়েছিল ‘মনের অঙ্গন’।

বড় হতে হতে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি আমার মায়ের নীরব শক্তি, অসীম ত্যাগ আর প্রতিদিনের সংগ্রাম। পরিবার, সন্তান এবং চারপাশের মানুষের জন্য তিনি সবসময় নিজের প্রয়োজন, স্বপ্ন ও মানসিক সুস্থতাকে পেছনে রেখে দিয়েছেন। আমার মায়ের মতোই অসংখ্য মা আছেন, যারা প্রতিদিন অনেক কিছু সহ্য করেন - কিন্তু সেই কষ্টগুলো খুব কমই কেউ দেখে, শোনে বা বোঝার চেষ্টা করে। তাঁদের অনুভূতি অনেক সময় নীরবতার আড়ালেই থেকে যায়। আজও মাঝে মাঝে ভাবি, যদি আমার মা এমন একটি নিরাপদ জায়গা পেতেন, যেখানে তিনি নিজের কথা বলতে পারতেন, কেউ তাঁকে মন দিয়ে শুনত, বুঝত এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিত - তাহলে হয়তো তাঁর পথচলাটা ভিন্ন হতে পারত।

আমি অতীত বদলে দিতে পারি না। কিন্তু আমি চাই, ভবিষ্যতের কোনো মা যেন সেই একই নীরব একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে না যান।
সেই বিশ্বাস, সেই ভালোবাসা এবং সেই দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে মমনের অঙ্গন - একটি নিরাপদ স্থান, যেখানে প্রতিটি মা নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে পারবেন, সহায়তা চাইতে পারবেন এবং কোনো বিচার ছাড়াই নিজেকে গ্রহণযোগ্য মনে করবেন।

Humayra Parvez Founder & Licensed Therapist Moner Angon

সহমর্মিতায় অনুপ্রাণিত, একটি অর্থবহ পরিবর্তনের লক্ষ্যে।

আমাদের লক্ষ্য

আমাদের লক্ষ্য হলো সহমর্মিতাপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে মাতৃত্বকালীন মানসিক সুস্থতাকে আরও শক্তিশালী করা। আমরা চাই মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সামাজিক সংকোচ দূর করতে, যাতে প্রতিটি মা নিরাপদ ও সহজলভ্য একটি পরিবেশে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে পারেন এবং কোনো ধরনের বিচার বা লজ্জার ভয় ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

আমাদের স্বপ্ন

আমরা এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো মাকে একা সবকিছুর ভার বহন করতে হবে না। যেখানে সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং সাহস ও আত্ম-যত্নের পরিচয় হিসেবে দেখা হবে। যেখানে প্রতিটি মা তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সুস্থ হয়ে ওঠার, নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়ার এবং ভালোবাসা ও সমর্থনের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

একজন মায়ের মানসিক সুস্থতার যত্নও তাঁর শারীরিক সুস্থতার যতটাই গুরুত্বপূর্ণ।

মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য বলতে গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মাতৃত্বের প্রতিটি পর্যায়ে একজন মায়ের মানসিক, আবেগিক ও সামাজিক সুস্থতাকে বোঝায়। মাতৃত্বকে আমরা প্রায়ই আনন্দময় একটি যাত্রা হিসেবে দেখি। কিন্তু এই সুন্দর যাত্রার পাশাপাশি অনেক মা অপ্রত্যাশিত মানসিক চাপ, জীবনের বড় পরিবর্তন, নতুন দায়িত্ব এবং নানা ধরনের আবেগগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।

তাই মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা শুধু মানসিক সমস্যার চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি মা নিজেকে নিরাপদ, সমর্থিত, সংযুক্ত এবং নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী অনুভব করেন।

moner-angon-mother's love

মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো

গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য

গর্ভাবস্থা এবং সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের মানসিক ও আবেগগত পরিবর্তনগুলোকে সহমর্মিতা, সচেতনতা এবং পেশাদার সহায়তার মাধ্যমে বোঝা ও সমর্থন করা।

উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও আবেগগত ক্লান্তি

অতিরিক্ত দায়িত্ব, দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অবসাদকে সময়মতো চিহ্নিত করে এমনভাবে সহায়তা করা, যাতে তা একজন মায়ের সুস্থতার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

সুস্থ সম্পর্ক ও সামাজিক সংযোগ

পরিবার, সঙ্গী এবং সমাজের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং অর্থবহ সামাজিক সংযোগ তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।

সংকোচ ছাড়াই সহায়তা চাওয়া

এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং সাহসের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয় এবং প্রতিটি মা সম্মান, বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা পান।

নিজের পরিচয় ও জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া

মাতৃত্ব একজন নারীর পরিচয়, সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনগুলোকে বুঝে ধীরে ধীরে নিজের নতুন পরিচয়কে গ্রহণ করতে পারাই আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-সহানুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে।

আবেগগত সুস্থতা

প্রতিদিনের অনুভূতিগুলোকে স্বাস্থ্যকরভাবে সামলানো, মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা এবং মাতৃত্বের পুরো যাত্রায় নিজের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করা।

যখন একজন মা ভালো থাকেন, তখন পুরো পরিবার ভালো থাকে।

একজন মায়ের মানসিক সুস্থতা তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে - নিজের যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে সন্তান, সঙ্গী, পরিবার এবং সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পর্যন্ত। তাই মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া শুধু একজন মায়ের জন্য নয়; এটি একটি সুস্থ পরিবার, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং আরও সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

আরও দৃঢ় মানসিক সুস্থতা

যখন একজন মা প্রয়োজনীয় সমর্থন পান, তখন তিনি মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে, জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাতৃত্বকে গ্রহণ করতে আরও সক্ষম হন।

সুস্থ ও সুন্দর পারিবারিক সম্পর্ক

একজন মায়ের মানসিক সুস্থতা পরিবারে ইতিবাচক সম্পর্ক, আন্তরিক যোগাযোগ এবং ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুর সুস্থ বিকাশ

যেসব শিশু ভালোবাসাপূর্ণ ও মানসিকভাবে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাদের আবেগগত, সামাজিক এবং মানসিক বিকাশ আরও ইতিবাচক হয়। একজন মায়ের সুস্থতা তাই শিশুর ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

সামাজিক সংকোচ ভাঙতে সহায়তা

মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা আরও বেশি মাকে নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে এমন একটি সমাজ গড়ে ওঠে, যেখানে সহমর্মিতা, বোঝাপড়া এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিটি যাত্রার শুরু হয় একটি ছোট্ট পদক্ষেপ দিয়ে।

মনের অঙ্গনে আমরা বিশ্বাস করি, একজন মা যখন সমর্থন পান, তখন পুরো পরিবারই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আমরা মায়েদের পাশে হাঁটতে এসেছি - তাঁদের পথচলাকে বিচার করতে নয়, বরং সমর্থন করতে।
কারণ কোনো মাকেই তাঁর সব ভার একা বহন করতে হওয়া উচিত নয়।